ঘিলুনামা, ০-তম খসড়া

দেশে কিছু বন্ধুগণ Kognizunt নামে একটা সংস্থানের মাধ্যমে বাংলা দেশে ছেলেমেয়েদের গবেষণার প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। তাদের আমার সেলাম। আর এই ছোট্ট উপহার।


সময় – ১৮৯০, স্থান – স্পেনের বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়। সদ্য শেখা এক নতুন বৈজ্ঞানিক কৌশলে মগজের অন্যতম কোষ – নিউরন বা স্নায়ুকোষ – দের নতুন চোখে দেখছেন এক বৈজ্ঞানিক তথা প্যাথলজিস্ট। তাঁর নাম সান্তিয়াগো রামন ই কাহাল (Santiago Ramón y Cajal)। আগামী কয়েক বছরে শ’খানেক নিউরনের পুঙ্খানুপুঙ্খ ছবি নিজে হাতে এঁকে, তাদের হরেকরকম অঙ্গীভঙ্গী, কাজকর্ম নিয়ে চর্চা করে পৃথিবীর সামনে তিনি প্রমাণ করবেন – মস্তিষ্ক কিন্তু একটানা অবিচ্ছিন্ন বস্তু দিয়ে তৈরী নয় – মস্তিষ্কের মৌলিক একক আছে – তা হল এই হরেক রকমের নিউরন, তারা একে অপরের সঙ্গে বৈদ্যুতিক এক অদ্ভূত ভাষায় কথোপকথন করে। ব্যাস, তারপর – বিশ্বজয়, নোবেল প্রাইজ আর স্নায়ুকোষের উপর নির্ভর করে এক নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণার পথ উন্মোচন –  স্নায়ুবিজ্ঞান বা neuroscience.

চলে আসা যাক ২০১৭ এ। স্থান – সুইৎজারল্যাণ্ডের জেনেভা শহর। ইউরোপীয় বৈজ্ঞানিক দের মধ্যে এক ঝগড়ার ফলে পৃথিবীর অন্যতম অর্থবহুল বৈজ্ঞানিক প্রকল্প (১৩০ কোটি ইউরো – ৭০ দিয়ে গুণ করে দেশী টাকায় কত আর বললাম না) – হিউম্যান ব্রেণ প্রজেক্ট (Human Brain Project বা HBP) – এর মুখ্য দপ্তর দুবছর আগে পাশের শহর লস্যান থেকে জেনেভায় স্থানান্তরিত হয়। এই বিকল্পের প্রস্তাবকারী বৈজ্ঞানিকরা বলেছিলেন যে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে যা হয় – তা কম্পিউটারের মাধ্যমে হুবহু করে দেখানো যাবে – যাকে বলে সিমুলেশন। ফলে আর জীবজন্তু কাটাছেঁড়া করে গবেষণার দরকার নেই – কম্পিউটারেই যা করার করা যাবে।

কিন্তু সে স্বপ্ন অনেক দূরই থেকে গেল, শুরু হল ঝগড়া। এত বিশালকায় মানুষের মগজাস্ত্র – তা এত সহজে ধরা দেওয়ার পাত্র নয়। আমাদের মগজে গড়ে প্রায় দশ হাজার কোটি নিউরন – বহু আলাদা ধরণের নিউরন – রোগা, মোটা, বেঁটে, লম্বা – সেই রামন ই কাহাল এর বহু ধরণ খোঁজার পরে আরও অনেক ধরণের নিউরন পাওয়া যায় – তাদের প্রত্যেকটা আবার একে অপরের সঙ্গে গপ্প করতে যে সংযোগ বানায় (এই সংযোগের জায়গাকে বলে সাইন্যাপ্স) তার সংখ্যা হল গড়ে দশ কোটি কোটি। ভুল করে দুবার কোটি লিখে ফেলিনি – ১ এর পরে ১৫ টা শূন্য পড়লে নম্বরটা দশ কোটি কোটিই দাঁড়ায়। আবার মানুষের মগজাস্ত্র চুপচাপ বসে থাকেনা – প্রত্যেক মুহূর্তে বদলায় – এই সাইন্যাপ্স বদলায় – নিউরন-এর সংখ্যা বদলায়, কিছু কিছু নিউরন মারা গেলে বাকিরা তার ভার নিজের কাঁধে নিতে তৎপর হয়ে নিজেদের বদলায় – কত কিছু। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এত ছোট্ট জায়গায় এই রকম দুরূহ জটিলতা আর কোথাও পাওয়া সার। তাই কম্পিউটারের মাধ্যমে এই পুরো জিনিসটার এক ক্ষুদ্র অংশ সিমুলেট করা যে কতটা দুরূহ ব্যাপার আর সেটা আদৌ অঢেল পয়েসা ঢেলে করা উচিৎ কি না – এই নিয়েই ঝগড়া। সে যাই হোক, শেষমেশ ঠিক হল HBP যা করছিল, তা করবে, তবে আরেকটু কম অলীক কল্পনার সাহায্য নিয়ে।

ইতিমধ্যে পৃথিবীর আরো বহু দেশ – আমেরিকা (BRAIN), জাপান (Brain/MINDS), চীন (China Brain Project), ক্যানাডা (Brain Canada) – সবাই নিজের নিজের মত করে বড়সড় স্নায়ুবিজ্ঞান প্রকল্প শুরু করতে তৎপর। আমেরিকা চায় যত বেশি সম্ভব, তত বেশি নিউরনদের কথাবার্তা একসাথে শোনবার জন্য যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করতে, জাপান তো চায় ইঁদুর বা অতিকায় বাঁদর না ব্যাবহার করে মার্মোসেট নামে এক ছোট্ট বাঁদর জাতীয় পশুর মস্তিষ্ক যাচাই করতে, চীন চেষ্টা করছে মগজের ব্যারামের উৎস খোঁজার। কিন্তু আদতে এই জেলি-জেলি ধাঁচের দেড় কিলো মাংসখণ্ড যে কিকরে মানবজাতির মগজাস্ত্র হয়ে উঠেছে – তার কোন আন্দাজ এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। এই যে আমাদের এই সংস্থার নাম কোগনিজান্ট – তার ব্যুৎপত্তি হলও cognition শব্দটা থেকে – অর্থাৎ বোঝার বা জানার ক্ষমতা- এই দেড় কিলো মাংসখণ্ড থেকে কিকরে মানুষের বোঝার বা জানার ক্ষমতার সৃষ্টি, বুদ্ধির সৃষ্টি, মানবসত্ত্বার সৃষ্টি হয়? আদৌ কি মগজের নিউরনদের  অবস্থান? হুবহু একটা মগজ বানাতে পারলে সেই মগজের সঙ্গে যোগ করে দেওয়া চোখের সামনে লাল গোলাপের ছবি রাখলে হুবহু নিউরনদের চালচলন হলে কি সেই মগজ গোলাপের ‘লালত্ত্ব’ বুঝতে পারবে? (একে বলে philosophical zombie paradox) প্রশ্নটা সহজ লাগলেও অত সহজ নয় – এর কোনো উত্তর এখনো অবধি নেই আমাদের কাছে। হয়ত সহজ ভাষায় এর উত্তর আমরা কোনোদিন নাও পেতে পারি।

বাকি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যত কিছুই আমরা বোঝার চেষ্টা করি বা সক্ষম হই – তা আমাদের এই ‘দেড় কিলো মাংসখণ্ড’-এর সুবাদে। ফলে এই মগজনামা বোঝা মানুষের নিজেকে চেনার আদিম অকৃত্রিম ইচ্ছার শেষ ধাপ, এটা বলাই যায়। পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, এমনকি মনোতত্ত্ব, দর্শণ – সবাই লেগে পড়ে আছে এই দেড় কিলো মাংসখণ্ড থেকে মানুষের মনুষ্যত্বের সৃষ্টিকে বোঝার কঠিন প্রচেষ্টায়! মগজকে বুঝতে গেলে এক বা দুজন বৈজ্ঞানিক দিয়ে চলবে না – এই আইন্সটাইনীয় সময় আর চিন্তাধারা আমরা অনেক দিন হল পিছনে ফেলে এসেছি। মস্তিষ্ক বুঝতে হলে পুরো পৃথিবীর মানুষকে একসাথে আসতে হবে কর্মকাণ্ডে – আর কোনো বিকল্প নেই – এতটাই জটিল এই প্রশ্ন। সবরকমের মানুষেরই দরকার এই কর্মকাণ্ডে শরিক হওয়ার জন্য – স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে। সিমুলেশন থেকে শুরু করে বা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র থেকে শুরু করেই হোক – হরেক বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে (মানে যত মত তত পথ আর কি) এই প্রবলেমটাকে সায়েস্তা করার চেষ্টা করা যায়। কোন পথটায় সঠিক রাস্তা মিলবে, জানা নেই – তবে আর যাই হোক না কেন – এই পথ চলাতেই আনন্দ।


সূত্রঃ

২। রামন ই কাহাল বাবুর ছবিঃ উইকিপিডিয়া, (পাবলিক)
৩। রামন ই কাহাল বাবুর দ্বারা আঁকা ছবিঃ কোয়ান্টা ম্যাগাজিন
Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s